Home » সাক্ষাৎকার » মানুষের খুব কাছে গিয়ে তার সমস্যা ও প্রয়োজন বিবেচনা করতে হয়
কান্ট্রি ডিরেক্টর, সেভ দ্য চিলড্রেন অস্ট্রেলিয়া

মানুষের খুব কাছে গিয়ে তার সমস্যা ও প্রয়োজন বিবেচনা করতে হয়

বর্তমান সময়ে পেশা হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ডেভেলপমেন্ট সেক্টর। এ সেক্টরের সফল ও নেতৃত্ব স্থানীয় একজন ব্যক্তি সুলতান মাহমুদ। যিনি

কান্ট্রি ডিরেক্টর, সেভ দ্য চিলড্রেন অস্ট্রেলিয়া

বর্তমানে  সেভ দ্য চিলড্রেন অস্ট্রেলিয়া’র বাংলাদেশে কান্ট্রি ডিরেক্টর। দীর্ঘ ৪১ বছরের পেশাগত জীবনের নানা দিক নিয়ে আমরা কথা বলেছি তার সাথে। আলাপচারিতার চৌম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো।

আপনি তো বাংলাদেশের শিশু অধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। আপনার শৈশব কেমন ছিল?
– আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে। বাবা সরকারি চাকুরিজীবী ছিলেন। তাই সাত বছর বয়সে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসি। যেহেতু গ্রাম থেকে শহর কাছাকাছি ছিল, তাই প্রায় সময়েই গ্রামে যেতাম। খেলাধুলা করতাম প্রচুর। আমাদের পাড়াভিত্তিক ক্লাব ছিল। ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলাম খেলাধুলা করার জন্য। আবার কয়েকটি গ্রাম মিলে একটা ক্লাব ছিল। এই ক্লাব থেকে খেলাধুলা ছাড়াও সাংস্কৃতিক  কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সেগুলোতে অংশ নিতাম।

বড় হয়ে কী হতে চেয়েছিলেন?
– তখনকার মানুষ জীবনের লক্ষ্য নিয়ে এখনকার তরুণদের মতো এতো সচেতন ছিল না। যখন দশম শ্রেণীতে উঠি তখন বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।

হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার কিন্তু কীভাবে ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে এলেন?
– তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। ১৯৭০ সালে একটি সাইক্লোন হয়। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্যে ইউনিভার্সিটির পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত মানুষকে সহায়তার জন্য পাশে দাড়াই। তখন বন্যাকবলিত এই মানুষগুলোর অসহায় অবস্থা আমাকে ভাবায়। মনের মধ্যে কষ্ট অনুভব করি। ভাবতাম কীভাবে এদের সাহায্য করা যায়। এই ভাবনা থেকেই ১৯৭২ সালে বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষকে সহায়তা দিতে একটি প্রকল্পের আওতায় চাকুরি নিই।

আপনি বলছিলেন দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষকে সহায়তার তাগিদ অনুভব করতেন। চাকরি পাওয়ার পর কীভাবে এই অনুভূতি আপনার কাজে লেগেছে?
– আমার প্রথম চাকরি ছিল দেশের প্রায় অর্ধেক জেলায় ঘুরে ঘুরে বিশেষ পরিস্থিতিগুলো পর্যবেক্ষণ করা। সাধারণ মানুষের সাথে মেশা। তাদের কোন ধরনের সহযোগিতা লাগে তা দেখা। চাকরি পাওয়ার পর ভোলায় গিয়ে আমি অবাক হয়ে লক্ষ করি তখনও বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলো। মানুষের মধ্যে দুর্যোগের প্রভাব অনেক দিন থেকে যায়। ওই ক্ষতিগুলো কাটিয়ে উঠতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল।

কীভাবে পরিকল্পনা করতে হয়?
– মানুষের খুব কাছে গিয়ে, তাদের সত্যিকার সমস্যা কী, তাদের কী প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করতে হয়। ‘যাকে সাহায্য করতে চাও, তার জায়গায় নিজেকে দাড় করিয়ে প্রশ্ন করো’।

কাজ করতে গিয়ে কখনো সমস্যায় পড়েননি?
– হ্যাঁ। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। যেমন: ১৯৮০ সালে জেন্ডার নিয়ে কাজ করছিলাম। তখন মেয়েরা ঘরের বাইরে যেতে চাইতো না। বিশেষ করে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মেয়েরা। তখন একজন পড়ালেখা জানা মেয়েকে আমাদের সংস্থায় বুঝিয়ে সুজিয়ে প্রথম মাঠকর্মী হিসেবে কাজে দেই। তার অফিসে আসা, মাঠপর্যায়ে কাজে যাওয়া -এসব কাজ করতে অনেকখানি হাটতে হতো। তাই ভেবেছিলাম তাকে যদি সাইকেল চালানো শেখানো যায় তাহলে তার জন্য ভালো হবে। একদিন সাইকেল চালানো শিখাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি গ্রামের লোকজন দৌড়ে আসছে মারার জন্য। তাদের ধারণা ছিল, সাইকেল চালানো শিখিয়ে মেয়েটিকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে।

আপনি বলছিলেন শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মেয়েরা  ঘরের বাইরে আসতে চায়নি। কিন্তু কেন?
– আমার কাছে মনে হয়, মানুষ ধর্মের চেয়ে লোকের কথাকে বেশি ভয় পায়। গ্রামে গিয়ে দেখবেন, দরিদ্র মহিলারা ঘর থেকে ঠিকই বের হয়ে মাঠে সাহায্য করতে চলে যায়। কিন্তু শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত মেয়েরা চাকরি করতে চায়না। কারণ লোকে বলবে অমুকের মেয়েটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ধর্মে তো কাজ করা বা বাইরে যেতে নিষেধ নেই। আসলে মানুষ, মানুষের কথাকে বেশি ভয় পায়। কথায় আছেনা ‘পাছে লোকে কিছু বলে’। এখানে মানুষের ভয়।

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কতদিন কাজ করেছেন?
– ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে যখন বাংলাদেশ সরকার জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করে তখন প্রথম শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করি। এ সময় আমার আফসোস হয়েছিল। ১৯৭২ সাল থেকেই কেন আমরা শিশুদের নিয়ে কাজ করিনি।

এই আফসোসের কারণ কী ?
– বাংলাদেশে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রথম কাজ শুরু হয় ত্রাণ দিয়ে। এরপর নারীর ক্ষমতায়নের জন্য কাজ শুরু করে। কিন্তু কীভাবে নারীদের কাছে পৌঁছনো যায় তা খুঁজে বের করতে পারছিলাম না। কারণ নারীদের কাছে যেতে হলে নারীর প্রয়োজন। আর তখন মেয়েরা চাকুরি করতে চাইতো না। শিশুদের নিয়ে কাজ করতে এসে দেখলাম শিশুদের মাধ্যমেই সবার কাছে পৌঁছানো সহজ। এবং শিশুদের জন্য সহযোগিতা ভাবাপন্ন ও বন্ধুত্বপূর্ণ একটি সমাজ বা রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে আসলে মা, বাবা, সমাজের অভিভাবক আসলে পুরো জাতিকেই ক্ষমতায়ণ করতে হবে। শিশুদের মধ্য দিয়ে এটা অনেক বেশি সহজ।

শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আপনার শিশুকালের কোনো অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে কি?
– হ্যাঁ। ওই যে ক্লাব করতাম, খেলাধুলা করতাম। এই অভিজ্ঞতাগুলো খুব কাজে লেগেছিল। সহজেই শিশুদের সাথে মিশতে পারতাম । তাদের বুঝতে পারতাম।

বাংলাদেশে শিশুদের নিয়ে কোন ধরনের কাজ হচ্ছে?
– বর্তমানে বেশিরভাগ কাজই হচ্ছে শিক্ষা, সুরক্ষা ও শিশুর অংশগ্রহণ কেন্দ্রিক। কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- শিশুর গভর্নেন্স। ধরুন, বই ও শিক্ষক দেয়া হলো। কিন্তু গভর্নেন্সের অভাব আছে তাহলে কখনো আপনার সফলতা আসবে না। এছাড়া শিশুর দারিদ্র ও সুরক্ষা নিয়েও কাজ করা জরুরি।

শিশুদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দিক নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কখনো হতাশা বোধ করেছেন?
– আমার জীবনের একমাত্র হতাশা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থার কারণে গরীব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা বিভিন্ন কাজ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। আর ধনীর সন্তানেরা জায়গাগুলো দখল করে নিচ্ছে। ধরুন, একটা গরিবের ছেলে কষ্ট করে এসএসসি পাস করলো। তারপর সে পরিবারের সহায়তার প্রয়োজনে বা দু’বছর কাজ করে টাকা জমিয়ে আবার পড়াশুনা করবে সেই সুযোগ আমাদের দেশে নেই। ফলে শিশুটি ঝড়ে পড়ছে। সুতরাং প্রথমে আমাদের দারিদ্র্য দূর করতে হবে।

এখন তো অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ দিচ্ছে?
– তা ঠিক। কিন্তু যারা ঋণ দিচ্ছে তারা কাদেরকে দিচ্ছে? যারা গরীব এবং তাদেরকে কিস্তিতে সে ঋণের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে। কখন সে চাকরি করবে? আর কীভাবেইবা পরিবারকে সাহায্য করবে। কখন পড়াশুনা করবে। আবার তো তাকে ঋণের টাকাও ফেরত দিতে হবে তাইনা?

নতুন প্রজন্ম যদি উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চায় তাহলে আপনার পরামর্শ কী?
– প্রথমে দরকার যাদের নিয়ে কাজ করতে চান তাদের প্রতি সহানুভূতি। তারপর বিষয়টা বুঝতে হবে। তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং একটা পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে এগুতে হবে। আমি মনে করি না, শিশুদের নিয়ে কাজ করতে হলে কোন সংস্থায় চাকরির চিন্তা করতে হবে। চাকরি না করেও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা বাড়ির আশেপাশের দরিদ্র শিশুদের উন্নয়নে অনেক কাজ করা সম্ভব।

আপনিতো ভেবেছিলেন ডাক্তার হবেন। কিন্তু হলেন শিশুদের বন্ধু। ডাক্তার হতে না পেরে কি আফসোস হয়?
– না। কারণ, ডাক্তার হলে কিছু মানুষের শারীরিক বা মানসিক সেবা দিতে পারতাম। এখন আমার সেবার পরিধি অনেক বড়। আমি পরিবার, সমাজ, ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শিশুদের উপযোগী একটা সমাজ গঠনে কাজ পারছি।

শিশু অধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
– শিশুদের জন্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, শিশুদের উপযোগী সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ একটি বাংলাদেশ গড়া। শিশুদের গভর্নেন্স, সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আমরা যতটুকু পারি, বাকিটুক আপনাদেরই বাস্তবায়ন করতে হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ
শান্তনু মনির

Career Intelligence on Youtube